ইংরেজি ‘Debate’ শব্দের বাংলা অর্থ হচ্ছে বিতর্ক। ইংরেজি শব্দটি ল্যাটিন উপসর্গ ‘de’ যার অর্থ হচ্ছে বিচ্ছিন্ন করা এবং ‘bature’ অর্থ হচ্ছে বারবার আঘাত করা। অথাৎ ক্রমাগত আঘাতের মাধ্যমে কোন কিছুকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। প্রসঙ্গিকভাবে বলা যায় বিতার্কিকরা যুক্তি তর্কের মাধ্যমে সত্যকে অসত্য থেকে, সুন্দরকে অসুন্দর থেকে এবং ন্যায়কে অন্যায় থেকে আলাদা করার প্রয়াস পান।
মানব জীবনে ও মানবসমাজে সত্যানুসন্ধানের কোন বিকল্প নেই। কোন কিছু সৃষ্টি করতে হলে সেই বিষয়ের উপর চিন্তা-ভাবনা, পড়াশুনা, জ্ঞানার্জন এবং সর্বপরি অনুশীলনের মাধ্যমে ঘাত-প্রতিঘাত, বাদ-প্রতিবাদ এর মাধ্যমে বেরিয়ে আসে নতুন কোন তত্ত¡-তথ্য,সত্য-অসত্য, ন্যায়-অন্যায়, কল্যান-অকল্যান, ভাল-মন্দ, প্রয়োজন-নিঃপ্রয়োজন ইত্যাদি। আর এ জন্যই প্রয়োজন বিতর্কের।
নিজের অর্জিত জ্ঞানকে যুক্তির কষ্ঠিপাথরে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত সত্যকে আবিস্কার করা সম্ভব। শিক্ষার্থীরা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনার পাশাপাশি বিতর্ক চর্চার মাধ্যমে তাদের মন ও মেধায় এ সৃজনশীলতার ছাপ লাগাতে পারে। আর বিতর্ক চর্চা ও এর অব্যাহত বিকাশের পূর্বশর্তই হচ্ছে বিতর্ক সংগঠন সৃষ্টি। জ্ঞানের দিগন্তের বিস্তৃতি, যুক্তিনিষ্ঠ মননের সমৃদ্ধি ও পরমত সহিষ্ণুতার স্থিতি প্রকৃতপক্ষে এসব গুনাবলী অর্জনের অবিসংবাদী বিশেষত্ব হিসাবে বিতর্ক চর্চা আজ সময়ের দাবী।
সমাজে বিদ্যমান অনেক কিছুই সমাজ সদস্যদের কল্যান বয়ে আনেনা। বরং কখনও কখনও অকল্যানকেও উষ্কে দেয়। মানব কল্যানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অভ্যাস, অনুশীলন, কর্ম ইত্যাদি বিষয়ের উপর বিতর্ক অনুষ্ঠান করা প্রয়োজন। এর ফলে এই উপলব্ধি তো আসতেই পারে-সমাজের জন্য কোনটি গ্রহনযোগ্য আর কোনটি নেতিবাচক।
ঘুষ, দুনীতি, ধর্ষন, যৌতুকপ্রথা, বাল্যবিবাহ, রাস্তা চলাচলা, মাদকসেবন এমনকি ধুমপানের মত কাজ করলেও আইনে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে, তারপরও এগুলা হচ্ছে। কিন্তু যে বা যারা এসব কর্মকান্ডের সাথে জড়িত তারা যদি আত্মসচেতন হতো তবে আইন মান্য করার প্রবনতা একদিকে যেমন বৃদ্ধি পেত অন্যদিকে তেমনি কমে আসতো এসব অপকর্ম। আর এ আত্মসচেতনতা সৃষ্টিতে বিতর্কের প্রয়োজনীয়তা অত্যাবশ্যক।
কারন ছাড়া যেমন কার্য সম্পাদিত হয়না ঠিক তেমনি একজন তার্কিক কোন বিষয়কে এমনি এমনি মেনে নেয় না। তার্কিকের অনুসন্ধানী যৌক্তিক মন খুঁজে চলে ঘটনার পিছনের ঘটনা, তুলে আনে নতুন কোন তত্ত¡-তথ্য, এরপর বিবেকের কষ্টি পাথরে ঘষে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের মাধ্যমে পৌঁছে যায় সঠিক সিদ্ধান্তে।
সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের হাত থেকে ব্যক্তি, পরিবার,সমাজ তথা গোটা জাতিকে মুক্ত করতে হলে বিবেকবোধকে জাগ্রত করতে হবে, হতে হবে আত্মসচেতন। আর এই আত্মসচেতনতা কিংবা বিবেক বোধ হঠাৎ করেই জন্ম নেয় না, এটা একটি অনুশীলন প্রক্রিয়া বা চর্চার ফল। বিতর্কিকরা বিতর্কে অবতীর্ণ হওয়ার মাধ্যমেই সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে আনে। তত্ত¡-তথ্যের ব্যখায় মগজের শানিত তলোয়ারে প্রতিপক্ষের খোঁড়া যুক্তিকে কেটে টুকরো টুকরো করে প্রতিষ্ঠা করেন নিজের যুক্তিকে। অন্ধকারের বেড়া জাল ছিন্ন করে দেখান আশার আলো। এ কাজটি নিঃসন্ধেহে অনেক কঠিন। আর এ কঠিন কাজটিকে সহজ করতে বিতর্ক চর্চার কোন বিকল্প নেই। আর তাই আরও বেশি বেশি বিতর্ক চর্চা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে, করতে হবে এর পরিচর্যা ও নিয়মিত অনুশীলন। যে কাজটি অত্যন্ত সু-নিপুন ভাবেই করে চলেছে ‘বিতর্ক পরিষদ কারমাইকেল কলেজ, রংপুর’। বিগত বছরে অনেক সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ হতে দেখেছি এই বাগানে। এই আমিই যদি আমার আমিত্বের গল্প শোনাই তাহলে বলবো আমি সেই বাগানেই (বিতর্ক পরিষদ) অঙ্কুরিত গাছের প্রস্ফুঠিত একটি ফুল। বিতর্ক চর্চার ফলেই বিবেকের স্বচ্ছ আয়নায় দেখতে পাই নিজেকে, দেখতে পাই সমাজের যত অসংগতি। আমি প্রতিরাতেই সেই স্বপ্নে বিভোর হই “বিতর্ক হবে পাঠক্রমের একটি অংশ”। এটি এখন সময়ের দাবীও বটে। সেই দিন হয়তো খুব বেশী দূরে নয় যেদিন ‘বিতর্ক’ হবে সকলের সিদ্ধান্তের মূল হাতিয়ার।
লেখকঃ মোঃ রেজাউল ইসলাম চৌধুরী (বিপ্লব), সম্মানিত সদস্য, বিতর্ক পরিষদ, কারমাইকেল কলেজ।
স্থায়ী ঠিকানাঃ গ্রামঃ আক্কেলপুর, পোষ্টঃ আক্কেলপুর, রংপুর সিটি কর্পেরেশন, রংপুর।
No comments:
Post a Comment