প্রতিবেদন: মাসুদ আলম কাব্য
২০১৮-১৯ সেশনের শুরুর দিকেই আমাদের যে অসাধ্য সাধন করতে হয়েছিল তা হলো একটি সফল শিক্ষা সফরের আয়োজন। অসাধ্য এ কারনেই বলছি, এই কার্যকরি পরিষদের হাতে গোনা কয়েকজন বাদে সকল সম্পাদকই নতুন। আর সংগঠনের কাজে অপটু এই নতুনদের নিয়েই শিক্ষা সফরের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাকিমা বানুকে আহ্বায়ক করে। শিক্ষা সফর সংক্রান্ত তারিখ ও স্থান ঠিক করা হয়। ঐতিহাসিক এবং শিক্ষামূলক স্থানগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে কান্তজিউ মন্দির ও সিংড়া ফরেস্ট যাওয়ার
সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
২৫ জানুয়ারি শুক্রবারে শিক্ষা সফরের দিন নির্ধারণ করা হয়। যেহেতু আমাদের সাথে অনেক সম্মানিত ও সাবেক সদস্যরা যাবেন, তাদের ছুটি সংক্রান্ত কোন সমস্যা যেন না হয় তাই শুক্রবারকে উপযুক্ত দিন হিসেবে বেছে নেয়া হয়। মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই আমরা সমস্ত কাজ গুছিয়ে ফেলি। সম্মানিত সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করা চাঁদা উত্তোলন , বর্তমান সদস্য এবং সম্পাদকের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে কাজ করিয়ে নেয়া। সব মিলিয়ে সফর শেষ হওয়ার আগে আমরা স্বস্থির নিশ্বাস ফেলতে পারিনি। আমাদের পরিকল্পনা যেহেতু বৃহৎ ছিল তাই কাজ তো বেশি হবেই। আর সমস্ত কাজেই নুরুল আমিন মিলন শেখ যেভাবে সাহায্য করেছেন ও পরামর্শ দিয়েছেন ফলে কাজ করা আমাদের জন্য সহজ হয়েছিল। ২৫ তারিখ বেলা ৯ টার দিকে আমরা কারমাইকেল কলেজ ক্যাম্পাস থেকে রওনা হই। আমাদের আমন্ত্রিত মেহমানগণ সহ শাহ্ আলম স্যার, সম্মানিত সদস্যগণ বন্ধু সংগঠনের প্রতিনিধিরা মিলে এক উৎসব মুখর পরিবেশ তৈরী । বাসের পেছনে চেয়ার গুলো রাখা হয়েছিল। আমি চেয়ারগুলোর উপরে বসে কে কি করছে সব দেখছিলাম, ও মজা পাচ্ছিলাম। বক্সে গান বাজছে সবাই সেই সাথে গলা মেলাচ্ছে। এই শিক্ষা সফরকে কেন্দ্র করে এসে প্রিয় মানুষগুলোকে কাছে পেয়ে সবার মুখে আনন্দে উদ্ভাসিত ছিল। আমাদের প্রথম গন্তব্য কান্তুজির মন্দির। সেখানে পৌঁছানোর পর আমরা নাস্তা খাই নাস্তায় ছিল পাউরুটি, কলা, ডিম। নাস্তার পরে আমরা ঐতিহাসিক কান্তজিউ মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করি । মন্দিরের নির্মাণশৈলী দেখে আমি অবাক হয়ে যাই ! এই মন্দিরের ঐতিহাসিক পরিচয় হলো কান্তজিউ মন্দির বা কান্তজিউ মন্দির অথবা কান্তনগর মন্দির। এটি নবরতœ মন্দির নামেও পরিচিত কারন, তিনতলা বিশিষ্ট এই মন্দিরের নয়টি চুড়া বা রতœ ছিল। কান্তজিউ মন্দির ১৮ শতকে নির্মিত একটি চমৎকার ধর্মীয় স্থাপনা, মন্দিরটি হিন্দু ধর্মের কান্ত বা কৃষ্ণের মন্দির হিসেবে পরিচিত যা লৌকিক রাধা কৃষ্ণের ধর্মীয় প্রথা হিসেবে বাংলায় প্রচলিত। দিনাজপুর শহর থেকে ২০ কিলোমিটার উত্তরে এবং কাহারোল উপজেলা সদর থেকে সাত কিলোমিটার দক্ষিন পূর্বে ইউনিয়নে দিনাজপুর ও তেঁতুলিয়া মহাসড়কের পশ্চিমে ঢেঁপা নদীর তীরে অবস্থিত এই মন্দির। আর এই মন্দিরের সবচেয়ে আকর্ষনীয় দিকটি হলো, সাত কান্ড রামায়ন পোড়ামাটির ফলকে চিত্রিত করা হয়েছে এই মন্দিরের দেয়াল। মন্দিরের জনৈক সেবক আমাদের বর্ণনা করে করে মন্দিরটি ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন।
এরপর আমরা রওনা করি আমাদের দ্বিতীয় গন্তব্য সিংড়া ফরেস্ট উদ্দেশ্যে। সেখানে আমরা বেলা সাড়ে বারটা নাগাদ পৌঁছে যাই। পথে বন্ধু সংগঠন কানাসারের সভাপতি সীমা সরকারের গান আমাদের সবাইকে মাতিয়ে রেখেছিল। সিংড়া ফরেস্ট ঘুরতে হয় ভ্যান ভাড়া করে, এক চক্কর ঘুরতে বেড়িয়ে পড়ি। অসংখ্য অগনিত গাছপালা, লতাপাতা, গাছের ডাল এসে মুখে ঝাপটা মারছিল। বনের ভেতর উইপোকার মাটি তুলে বড় বড় ডিবি তৈরী করেছে, যেগুলো দেখার মত সুন্দর। এই বনের চারপাশে আবার আদিবাসীদের বসবাস রয়েছে। তারা কৃষি কাজ করে জীবন যাপন করে। আমরা সবাই প্রকৃতির একেবারে খুব কাছাকাছি হারিয়ে গিয়েছিলাম, সেখানে ঘুরে যে আনন্দ পেয়েছি। অন্য কোন পার্কে বা কৃত্তিম কোনো দর্শনীয় স্থানে গেলে পাওয়া সম্ভব হতো না।
আমরা ঘুরাঘুরি শেষ করে এসে দেখি রান্নার কাজ অনেক এগিয়ে গেছে। তখন আমাদের উপস্থাপিকা মিনারা ইয়াসমিন সবাইকে আহ্বান করলেন শিক্ষা সফরের অন্যতম আকর্ষন খেলাধুলায়। ইতোমধ্যে আমাদের মাঝে এসে পৌঁছেছিলেন, কারমাইকেল কলেজের সম্মানিত অধ্যক্ষ জনাব প্রফেসর ড. শেখ আনোয়ার হোসেন। স্যারকে পেয়ে আনন্দে মাত্রাটা একটু বেড়েই গিয়েছিল। প্রথমে যে খেলাটি শুরু করা হয় তা হলো মেয়েদের বল নিক্ষেপ। খুব মজায় মজায় খেলাটি চলতে থাকে শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হন আমাদের সম্মানিত সদস্য পারভেজ এলাহি উপল ভাইয়ার স্ত্রী, মেয়ে এবং আমাদের সদস্য আসিয়া খাতুন। এরপর শুরু হয় সাবেক ও সম্মানিত সদস্যদের বেলুন সংরক্ষনের খেলা। খেলাটি খুবই আকর্ষনীয় ও মজাদার ছিল, নিজের বেলুন হেফাজত করে অন্যেও বেলুন ফাটানোর মজাই আলাদা।
তারপর শুরু হয় আরেকটি মজার খেলা তা হলো “বধূর কপালে টিপ পরানো” সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল টিপ দিয়ে বাংলাদেশি একজন নায়িকার ছবি লাগিয়ে তার কপালে টিপ পরানোর কসরত করে। সবাই নাকে, মুখে, চোখে, বুকে, ছবির বাইরে টিপ পরায়। শেষ পর্যন্ত আমাদের বন্ধু সংগঠন স্পন্দনের সাগর ভাই টিপ পরিয়ে বিজয়ী হন। আমাদের অধ্যক্ষ স্যার এবং শাহ্ আলম স্যার এই টিপ পরানো দেখে খুব হাসছিলেন। অধ্যক্ষ স্যারকে এর আগে অমন প্রাণ খুলে হাসতে দেখিনি।
খেলা শেষে খাওয়া পর্ব শুরু হয়, সবাই ক্ষুধার্ত আর বেলাও পরে এসেছে সকলেই খুব তৃপ্তি করে খাওয়া দাওয়া করে। খাওয়ার পরে আমাদের শান্তনার নেতৃত্বে পান বিতরণের দলটি সবার মাঝে পান বিতরণ করে। এরপর হয় লটারি ড্র। আমি একটি টিকেট কেটেছিলাম, কুড়িতম পুরস্কারটি ভাগ্যবলে আমি পেয়ে যাই। আমাদের সম্মানিত সদস্য জোবায়েদ হোসেন পলাশ ভাইয়া তাঁর টিকিটগুলো মাটিতে বিছিয়ে নামগুলো দেখছিলেন আর অপেক্ষা করছিলেন যে, এইবার বুঝি তার ভাগ্য খুলবে। কিন্তু বিধিবাম, ইতোমধ্যেই ইফফাত আরা ও অন্যান্য আপুরা কয়েকটি পুনস্কার জিতে নিয়েছেন। এভাবে মজায় মজায় আমাদের সমস্ত কার্যক্রম শেষ হলে আমরা কারমাইকেল কলেজ অভিমুখে যাত্রা শুরু করি মাগরিবের পরে।
ফেরার পথে পুরো পথ জুড়ে নাচ-গানে বাস মাতিয়ে তোলে কাকাশিসের সভাপতি খাইরুল ইসলাম খোকন। আমরা কয়েকজন আঞ্চলিক বিতর্কে মেতে উঠি, রাত সাড়ে আটটা নাগাদ আমরা লালবাগে এসে পৌঁছি। এভাবে একরাশ তৃপ্তির মধ্যদিয়ে শেষ হলো আমদের শিক্ষাসফর।
No comments:
Post a Comment