আমরা প্রতিনিয়ত নানাবিধ বিষয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ডাক্তার হব নাকি ইঞ্জিনিয়ার হব, পদার্থ পড়ব নাকি রসায়ন পড়ব, শীতের ছুটিতে সমুদ্রে যাব নাকি পাহাড়ে
ইত্যাদি। এই প্রত্যেকটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমরা ভালো-মন্দ, লাভ-ক্ষতির হিসেব করি। যেমন ধরুন, আপনার এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দুজনে প্রার্থী রয়েছে। আপনি চিন্তা করেন- কে নির্বাচিত হলে আপনার এবং আপনার এলাকার অধিক উন্নয়ন হবে, দুজনের মধ্যে কে অধিক জনবান্ধব, কে আপনার রাজনৈতিক দর্শন ধারণ করে প্রভৃতি। এরকম একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ শেষে আপনি যে কোনো একজনকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এই ধরেনর তুলনামূলক বিশ্লেষণই বিতর্ক। অর্থাৎ প্রতিনিয়ত ছোট-বড় প্রতিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় আমরা প্রত্যেকেই নিজের সাথে নিজে বিতর্ক করি, করি অপরের সাথেও। এই ব্যক্তিগত পরিমন্ডলের বাইরে সামাজিক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই বিতর্কের চর্চা হয়ে আসছে।প্রচীন গ্রীসে সক্রেটিস ক্রিটিকাল থিংকিং বা উচ্চতর চিন্তন দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রশ্ন উত্তরের মাধ্যমে সংলাপের আয়োজন করতেন। যা ‘সক্রেটিক মেথড’ নামে পরিচিত। সক্রেটিস পূর্ব যুগে প্রোতোগোরাস, প্রডিকাস, হিপ্পিয়াস, গর্গিয়াস প্রভৃতি দার্শনিকেরা বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য দিতেন এবং তর্ক করতেন। এই ঘরানার দার্শনিকেরা সোফিস্ট নামে পরিচতি। তারা কোনো নির্দিষ্ট দর্শনের অনুসারী ছিলেন না। তারা তর্ক এবং যুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ের ব্যাখ্যা প্রদান করতেন। অন্যতম সোফিস্ট দার্শনিক প্রোতোগোরাসকে বিতর্কের আদিপুুরুষ হিসেবে অ্যাখ্যায়িত করা হয়। বিতর্কের এই চর্চা এথেনিয়ান গণতন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে আবির্ভূত হয়। সোফিস্টারা মূলত প্রচলিত আইন, প্রথা, ধারণা ও ধর্মের পর্যালোচনা করতেন, বিরোধীতাও করতেন। প্রচলিত ধারণার এই বিরুদ্ধাচারণের চর্চা আমরা আরো বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখতে পাই। মধ্যযুগের অধিকাংশ সময় জুড়ে ইউরোপে সাধারণভাবেই চিন্তার স্বাধীনতা সীমিত ছিল, কোন এক চিন্তাকে ঐতিহ্যের বিপরীত বলে ভাবা হলে ‘ইনকুইজিশন’ নামে পরিচিত ধর্মীয় আদাদলত তাকে শাস্তি দিতো। ফলে বিতর্কের সুযোগ প্রায় ছিল না। টলেমির পৃথিবী কেন্দ্রিক সৌর মডেল দীর্ঘদিন যাবৎ জনমানসে গৃহীত ছিল। নিকোলাস কোপার্নিকাস তার সৌরকেন্দ্রিক মডেলের মাধ্যমে নতুন চিন্তার সূত্রপাত ঘটান। জিওর্দানো ব্রæনো সৌরকেন্দ্রিক মডেলের প্রচার করায় চার্চ জীবন্ত পুড়িয়ে মারে। কারণ সৌরকেন্দ্রিক মডেল বাইবেল প্রাচারিত পৃথিবীর নকশার বিপরীত বলে ভাবা হতো। পরবর্তীতে গ্যালিলিও প্রত্যক্ষ প্রমাণের ভিত্তিতে এই তত্ত¡ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করলেও তাকে ধর্মীয় আদালত শাস্তি দেয়। ডারউইন বিজ্ঞাননের চিন্তায় একেবারে নতুন তত্ত¡ আনলেও ইউরোপে ততদিনে ঘটা সামাজিক অগ্রগতির কারণে তাকে বিতর্কের মুখোমুখি হতে হয়েছে, কিন্তু চার্চ ও আদালতের মুখোমুখি হতে হয়নি। বিবর্তনাবাদকে কেন্দ্র করে ১৮৬০ সালে অক্সফোর্ড বিখ্যাত হাক্সলি-উইলবারফোর্স বিতর্ক চিন্তার সংঘাতের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। এভাবেই তুলনামূলক আলোচনা তথা বিতর্কের মাধ্যমে মানব সভ্যতা তার অগ্রগতির পথ খুঁজে নিয়েছে। ভারতীয় ঐতিহ্যেও বিতর্কের চর্চা পরিলক্ষিত হয়।
মহাভারতের সংঘাতময় পরিস্থিতিতে কুশীলবরা পরস্পরের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে, ন্যায্যতা প্রতিপাদন করতে বিতর্ক করেছেন। সাহিত্যের এই তর্কগুলো আসলে বাস্তব জীবনে বিভিন্ন মতাবাদ ও দর্শনেরই প্রতিফলন। প্রচীন আমাল থেকেই উপমহাদেশের বিভিন্ন দার্শনিক ও ধর্মীও সম্প্রদায় ধারা পরস্পরের সাথে বিতর্ক করে এসেছে। এদের মাঝে চার্বাক, জৈন, বৌদ্ধ, সনাতনী অজ¯্র ধারা ভূমিকা রেখেছে। প্রত্যেকেই নিজস্ব দার্শনিক অবস্থান বিতর্কের মধ্য দিয়েই পরিপুষ্ট করেছে। বৈজ্ঞানিক বিতর্ক প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত উপাত্তের ব্যাখ্যা নিয়ে কাজ করে এবং বিতর্কের মাধ্যমে অম্বেষনের চেষ্টা করে কোন ধারণা তুলনামূলকভাবে উপযোগী। উদাহরণস্বরূপ, ২০ শতকের গোড়ার দিকে বুদ্ধ্যাস্ক পরিমাপের যাত্রা শুরু হওয়ার পর থেকে জাতি এবং তারা বুদ্ধিমত্তা নামক বিষয়টি পপুলার সায়েন্স এবং প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার মধ্যকার বিতর্কের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এই ধরনের বিতর্কের মাধ্যমে সবচেয়ে প্রায়োগিক, আর তুলনামূলক শ্রেয়তর উপাত্তের সৃজন হয়। এই ধরনের বিতর্ক বিজ্ঞানী এবং মানবজাতির জন্য উপকার বয়ে আনে। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানের অগ্রগতি সাধন হয়।
লেখক : মোঃ তানবিরুজ্জামান, সহকারী শিক্ষক, নৃপেন্দ্র নারায়ণ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, দেবীগঞ্জ, পঞ্চগড়।
প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক, বিতর্ক পরিষদ ও ১৬ তম জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক প্রতিযোগিতার বিজয়ী দলের তার্কিক
তথ্য সূত্র ঃ
আজকের বিতর্ক
(প্রতিযোগিতামূলক বিতর্কের আদ্যোপান্ত)
এফ এইচ ইয়াসিন শাফি
বৈজ্ঞানিক বিতর্ক (উইকিপিডিয়া)

No comments:
Post a Comment